ধারণা করা হয় ডেঙ্গু নামটি এসেছে সোয়াহিলি ভাষার কা-ডিঙ্গা পেপো থেকে যার অর্থ খারাপাত্তা বাহিত রোগ আঠারো শতকের শেষের দিকে এ রোগের আরেকটি নামকরণ করা হয় ব্রেক বোন ফিভার যার অর্থ হাড়ভাঙ্গা জর ডেঙ্গুজ্বরে আক্রান্ত রোগীদের কষ্টের তীব্রতা থেকেই এ ধরনের নামকরণ করা হয়েছে 1779 ও 1780 সালে এশিয়া আফ্রিকা ও উত্তর আমেরিকায় সর্বপ্রথম ডেঙ্গু মহামারী দেখা যায় পরবর্তীতে 1906 সালে প্রথম আবিষ্কার করা হয় এডিস ইজিপ্টি নামক এক ধরনের মশা ডেঙ্গু রোগের জীবাণু বহন করে
এই এডিস মশা ইয়েলো ফিভার জিকা ভাইরাস ও চিকুনগুনিয়া ভাইরাসের বাহক পৃথিবীর প্রায় সাড়ে তিন হাজার প্রজাতির মশার মধ্যে এডিস ইজিপ্টি অন্যতম ভয়ঙ্কর মশা এই জাতের স্ত্রী মশা ডেঙ্গু নামের এক ধরনের ভাইরাস বহন করে মানব শরীরের ডেঙ্গু রোগ ছড়িয়ে দেয় ডেঙ্গু ভাইরাস এর পাঁচটি ধরণ রয়েছে এবং প্রত্যেকটি ধরণী ডেঙ্গু রোগ সৃষ্টি করতে পারে সাধারণত এডিস মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগ হলেও অন্যান্য সাধারণ মশাও এই রোগ ছড়াতে সাহায্য করে ডেঙ্গু আক্রান্ত ব্যক্তিকে যদি কোনো সাধারণ মশা কামড়ায় তবে সেই সাধারণ মশাটি ও ডেঙ্গু রোগের জীবাণু বাহি হয়ে পড়ে এরপর থেকে সেই সাধারণ মশার কামড়ে ডেঙ্গু রোগ ছড়াতে পারে
প্রায় 400 বছর আগে আফ্রিকায় এডিস মশার জন্ম পরবর্তীতে ধীরে ধীরে এই মশা পৃথিবীর প্রায় সকল গ্রীষ্মমণ্ডলীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে অনেক গবেষকদের ধারণা ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনকীরা আফ্রিকা থেকে মশার এই জাতটি জাহাজে করে এশিয়া ও আমেরিকায় নিয়ে আসে পরবর্তীতে 1962 সালে আমেরিকা মহাদেশের 18 টি দেশ থেকে এডিস ইজিপ্টি কে নির্মূল করা সম্ভব হয়েছিল বর্তমানে এই মশা এশিয়া অঞ্চলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করছে সে কারণে এই মশা এশিয়ান টাইগার মস্কিত নামেও পরিচিতি পেয়েছে বাংলাদেশে 2000 সালে প্রথম এডিস বাহিত ডেঙ্গু রোগীর সন্ধান পাওয়া যায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বের এশিয়া আফ্রিকা অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকায় 100 টি দেশের প্রায় 250 কোটি মানুষ ডেঙ্গু ঝুঁকির মুখে রয়েছে
সংস্থাটির মতে বছরে 50 লাখ থেকে 1 কোটি মানুষ ডেঙ্গু ভাইরাস আক্রান্ত হচ্ছে এর মধ্যে আনুমানিক সাড়ে 12 হাজার মানুষ মৃত্যুবরণ করছে ভাইরাসের বিবর্তন জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিকল্পিত ও অধিক জনসংখ্যার নগরায়ন অপর্যাপ্ত ও অস্বাস্থ্যকর বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনার কারণে ডেঙ্গুর বিস্তার সহজে কমানো যাচ্ছে না আমাদের শরীর যখন কোন ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয় তখন আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা নিজে নিজেই ভবিষ্যতে সেই ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করার শক্তি অর্জন করে পরিচিত ভাইরাসের বিরুদ্ধে কাজ করা এই বিশেষ শক্তিকে বলে অ্যান্টিবডি কিন্তু বর্তমানে ডেঙ্গু জীবাণু ক্রসরিয়াকশনের কারণে ডেঙ্গুর বিরুদ্ধে আমাদের শরীরে অ্যান্টিবডি কাজ করছে না বরং বর্তমানে কারো দ্বিতীয় বা তৃতীয় বার ডেঙ্গু হলে তার এই রোগে মারা যাবার সম্ভাবনা অনেক বেশি
রোগের লক্ষণ:
2009 সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ডেঙ্গু রোগের কিছু লক্ষণ প্রকাশ করেছিল সেগুলো হলো
- তীব্র পেটব্যথা
- মাত্রাতিরিক্ত বমি হওয়া
- শরীরে পানি জমে যাওয়া
- মুখে ও চোখে সাদা অংশে রক্তের ছাপ দেখা যাওয়া
- প্রচন্ড ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করা
- লিভার সামান্য বড় হয়ে যাওয়া
- রক্ত পরীক্ষায় প্লাটিলেট কমে যাওয়া
কিন্তু ভাইরাসের এর গঠনগত পরিবর্তন হওয়াতে অনেক ক্ষেত্রে এসব লক্ষণ ছাড়াও কোন ব্যক্তির ডেঙ্গু আক্রান্ত হতে পারে বিশেষ করে বর্তমান সময়ে ছড়িয়ে পড়ার ডেঙ্গুতে এসব সাধারণ লক্ষণ খুব কমই দেখা যাচ্ছে তাছাড়া এ বছর আক্রান্ত ব্যক্তিদের মধ্যে মৃত্যুর হার অনেক বেড়ে যাবার কারন হল অধিকাংশ রোগীকেই রোগের তীব্রতা অনেক বেড়ে যাবার পর হাসপাতালে আনা হয়েছিল তাই এই মৌসুমে যেকোনো জ্বরের সাবধান হতে হবে জ্বর হলে কোন হাতুড়ে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের কাছে গিয়ে চিকিৎসা নিতে হবে এবং সেই সাথে ডেঙ্গু পরীক্ষা করাতে হবে
ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ অন্য সব ভাইরাস রোগ এর মত হলেও ডেঙ্গু রোগের লক্ষণ বদলে যাচ্ছে কেন সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরা দু'দলের বিভক্ত হয়ে পড়েছেন একদল মনে করছেন ডেঙ্গু ভাইরাস এর অভিযোজন ঘটার ফলে একটি উপজাতির সৃষ্টি হয়েছে কোন ভাইরাসের দেহে অভিযোজন ঘটে মহামারীর আশঙ্কা থাকে অন্য দল মনে করছেন এডিস মশার অধিক প্রজননের কারণেই দ্রুত এই রোগের জীবাণু ছড়িয়ে পড়ছে এবং একেক জনের শরীরে একেক ধরনের লক্ষণ দেখা যাচ্ছে ডেঙ্গু জ্বরের কোন নির্দিষ্ট চিকিৎসা নেই রোগের লক্ষণ এর উপর চিকিৎসা নির্ভর করে ডেঙ্গু রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা সাধারণত এক সপ্তাহ থেকে 10 দিনের মধ্যে সুস্থ হয়ে ওঠে কিন্তু ডেঙ্গু প্রভাবিত অন্য কোন উপসর্গ দেখা দিলে রোগীর অবস্থার অবনতি হয় এক পর্যায়ে ডেঙ্গু রোগের জীবাণু প্রাণঘাতী হতে পারে
ডেঙ্গু জ্বর হলে যে কারণে সবচেয়ে বেশি রোগী মারা যায় তা হল রোগীর রক্তে প্লাটিলেট কমে যাওয়া প্লাটিলেট হলো রক্তের এক ধরনের ক্ষুদ্র কণিকা বা অনুযোগ প্লাটিলেট রক্ত জমাট বাঁধতে ও রক্তক্ষরণ বন্ধ করতে সাহায্য করে রক্তে প্লাটিলেট এর মাত্রা কমে গেলে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি দেখা দেয় একজন সুস্থ মানুষের প্রতি 100 মিলিলিটার রক্তে প্লাটিলেট
এর হার প্রায় দেড় লাখ থেকে চার লাখ পর্যন্ত হয় এই প্লাটিলেট সংখ্যা 20 হাজারের নিচে নেমে এলে কোন প্রকার আঘাত ছাড়াই রোগীর রক্তক্ষরণ হতে পারে ডেঙ্গু রোগের কোন প্রতিষেধক নেই মশার বংশ বৃদ্ধি রোধ করায় এ রোগের একমাত্র প্রতিরোধব্যবস্থা 5 ধরনের ডেঙ্গু ভ্যাকসিন নিয়ে গবেষণা চলছে তার মধ্যে কয়েকটি ভ্যাকসিনের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে তবে ভ্যাকসিন আবিষ্কার এর আগে ডেঙ্গু প্রতিরোধ করতে হলে এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই
এই মশা ঘন জঙ্গলে নয় বরং লোকালয় এর মধ্যেই থাকে বাড়ির আশেপাশে ছড়িয়ে থাকা ছোটখাটো আবদ্ধ জলে এরা বংশবিস্তার করে ফুলের টব ডাবের খোসা রাস্তার সীমিত জলাবদ্ধতা সহ গোসলখানার জমে থাকা পানিতে এডিস মশা জন্ম নেয় সেজন্য বাড়ির আশেপাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে কোথাও যেন বৃষ্টির পানি জমে না থাকে সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে গোসলখানায় কোন পানি পাঁচ দিনের বেশি জমি রাখা যাবে না ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীদের জন্য বিশেষজ্ঞদের দেওয়া কয়েকটি পরামর্শ হলো ডেঙ্গু ভালো না হওয়া পর্যন্ত রোগীকে বিশ্রামে থাকতে হবে পানি শরবত ডাবের পানি বা অন্যান্য তরল খাবার বেশি বেশি গ্রহণ করতে হবে খাদ্য গ্রহণে অসুবিধা হলে শিরাপথে স্যালাইন দেওয়া যেতে পারে জ্বর কমাতে প্যারাসিটামল জাতীয় ওষুধ গ্রহণ করা যেতে পারে
কিন্তু ব্যথা কমাতে পেইনকিলার বা ব্যথানাশক ঔষধ কিছুতেই খাওয়া যাবে না এতে রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বেড়ে যেতে পারে ডেঙ্গু সংক্রমণ থেকে রক্ষা পেতে কিছু বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে এডিস মশা সাধারণত দিনের বেলা কামড়ায় তবে রাতে উজ্জ্বল আলোতে এরা কামড়াতে পারে শরীরের অনড়াবৃত অংশে যথাসম্ভব ঢেকে রাখতে হবে দিনে বা রাতে কখনোই মশারী ছাড়া ঘুমানো উচিত নয় জ্বর হলে নিজে নিজে চিকিৎসা না নিয়ে অতি দ্রুত ডাক্তারের কাছে যেতে হবে ভিটামিন সি জাতীয় দেশীয় ফল বেশি করে খাওয়া উচিত কারণ এগুলোর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ায় ধুমপানের অভ্যাস থাকলে তা ত্যাগ করা উচিত কারণ এটি রক্তের উপাদান এর তারতম্য ঘটায় অতীতের ভিয়েতনাম অস্ট্রেলিয়া ব্রাজিল ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলো এডিস মশা নিয়ন্ত্রণের সফলতা পেয়েছে আমাদের দেশেও এ ব্যাপারে সম্ভাব্যতা যাচাই করে স্থায়ী সমাধানের দিকে যেতে হবে তবে প্রতিটি নাগরিক সচেতন না হলে কোন সরকারের পক্ষেই এককভাবে এই চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব নয়।
Tags
স্বাস্থ্যপাতা
