স্মার্টফোনের কারণে স্মৃতিশক্তি হারিয়ে যাচ্ছে !


আমাদের মস্তিষ্ক এবং স্মার্টফোনের মধ্যকার সম্পর্ক অত্যন্ত জটিল একটু একটু করে মানুষের জীবনে স্মার্টফোনের প্রভাব বৃদ্ধি পেয়েছে আর বর্তমান এই প্রভাব এতটাই বেশি যে তা মহামারি চেয়েও ভয়ানক আকারে ছড়িয়ে পড়েছে এর অন্যতম কারণ হলো আমরা আমাদের স্মার্টফোনের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি অতিরিক্ত স্মার্ট ফোন ব্যাবহার আমাদের স্মৃতি শক্তি ধরে রাখা এবং নতুন স্মৃতি গঠনে বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে শুধু তাই নয় স্মার্টফোনের কারণে আমাদের মস্তিষ্কে নানান ধরনের ক্ষতিকর প্রভাব পড়ছে এবং ব্রেইন টিউমার ও ক্যান্সার এর ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে অতিরিক্ত স্মার্ট ফোন ব্যবহার কিভাবে আমাদের মস্তিষ্কের কার্যপ্রণালী বদলে দিচ্ছে সে সম্পর্কে আলোচনা করা হবে। 

বর্তমানে আমরা অধিকাংশ মানুষই প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সময় ইন্টারনেটে কাটাই এর ফলে আমরা দীর্ঘস্থায়ী মানসিক চাপ বিচ্ছিন্নতা ক্লান্তি এবং বিষন্নতায় ভুগছি আমরা অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সময় কাটিয়ে বাস্তব জগত থেকে মনোযোগ সরিয়ে নিজেকে শান্ত রাখি কিন্তু অন্তহীন ফেইসবুক স্ক্রোলিং ও মানসিক চাপ তৈরি করে এবং ফোনের খুদেবার্তা ও বারবার নোটিফিকেশন চেক করা ও মানসিক চাপ সৃষ্টির অন্যতম কারণ আমরা গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয় মনে রাখার জন্য মস্তিষ্কের চেয়ে স্মার্টফোনের উপর অনেক বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছি অবচেতনে তৈরি হওয়া এই অভ্যাসটি আমাদের স্মৃতি শক্তির কার্যপনালি পরিবর্তন করে দিচ্ছে এই বিষয়টিকে বলা হচ্ছে ডিজিটাল অ্যামনেশিয়া কেমব্রিজের স্নায়ুবিজ্ঞানী বারবারা সাকিয়ান 2010 সালে একটি পরীক্ষা করেছিলেন তিনি তিনটি দলকে কয়েকটি বিষয় পড়তে দেন পড়া শুরু করার আগে একটি দলের সদস্যদের কে তাদের মোবাইলে মেসেজ দেওয়া হয় আরেকটি দল পরীক্ষা চলাকালীন সময়ে মেসেজ পায় এবং তৃতীয় দল কোনো ম্যাসেজই পায়নি পরবর্তীতে দেখা যায় যে যারা মেসেজ পেয়েছেন তারা একটু আগেই যা করেছে তা মনে রাখতে পারেনি এ থেকে বোঝা যায় স্মার্টফোনের কারণে আমরা আমাদের দৈনন্দিন জীবনে মনোযোগ দিতে পারছি না। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে একটি গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে যার নাম Adolescent Brain Cognitive Development এ কে সংক্ষেপে বলা হয় ABCD Study এটি মস্তিষ্কের বিকাশ এবং শিশুস্বাস্থ্যের সবচেয়ে বড় এবং দীর্ঘমেয়াদী গবেষণা এই প্রকল্পের 10000 আমেরিকান শিশুকে প্রাপ্ত বস্ক হওয়ার আগ পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছে এবিসিডি স্টাডিতে দেখা যায় স্মার্টফোনের ব্যবহার মস্তিষ্ককে পরিবর্তন করে ফেলছে এই পরীক্ষার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলগুলো একটি হলো যে শিশুরা প্রযুক্তির ব্যবহার করে তাদের মস্তিষ্কের কর্টিক্যাল পাতলা হয়ে যাচ্ছে বিজ্ঞানীরা বলেন অল্পবয়স্ক শিশুরা যারা বেশি প্রযুক্তি ব্যবহার করে তাদের একটি কর্টেক্স পাতলা ছিল যদিও শিশুরা আরো বড় হওয়ার পর এমনটা ঘটার কথা ছিল বয়স বৃদ্ধি পেলে এবং বৃদ্ধ হলে সাধারণত কর্টিক্যাল পাতলা হয় মস্তিষ্কের কর্টিক্যাল পাতলা হয়ে গেলে পারকিনসন এবং আলঝেইমারের মত স্মৃতিভ্রম রোগ হতে পারে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা স্মার্টফোনকে পসিবল হিউম্যান কারসিনোজেন বা সম্ভাব্য মানব ক্যান্সার জনক হিসেবে চিহ্নিত করেছে দীর্ঘসময় স্মার্টফোনের ব্যবহার ব্রেইন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায় ফিনল্যান্ডের রেডিয়েশন এন্ড নিউক্লিয়ার সেফটি অথরিটি দুই বছর যাবত একটি গবেষণা চালিয়েছে সেই গবেষণায় দেখা যায় মোবাইল ফোনের রেডিয়েশন ব্রেইন টিস্যু ধ্বংস করে দেয় শুধু তাই নয় অধিক ফোন ব্যবহারের কারণে ব্রেইন টিউমার হতে পারে 

স্মার্টফোনের কারণে শিশুদের মাথায় বড়দের তুলনায় 10 গুণ বেশি ক্ষতিকর বিকরণ ঘটে স্মার্টফোনের আলো আমাদের ঘুমের মারাত্মক ব্যাগাত ঘটায় এসব ডিভাইসের কৃত্রিম আলোর কারণে মেলাটোনিন হরমোন নিঃসরণ হয় এই হরমোনের আমাদের শরীরকে ঘুমের জন্য প্রস্তুত করে স্মার্ট ফোনের ক্ষতিকর প্রভাবে মানুষের স্মৃতি ধরে রাখার ক্ষমতা হ্রাস পাচ্ছে কারণ আমরা বিভিন্ন বিষয় মনে রাখার জন্য স্মার্ট ফোনের উপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল কানাডার ম্যাকগিল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক অলিভার হার্ড বলেন আপনি একবার যখন আপনার স্মৃতিশক্তি ব্যবহার করা বন্ধ করবেন তখন এটি আরও খারাপ হয়ে যাবে যা আপনাকে আপনার ডিভাইস গুলোর উপর আরো বেশি নির্ভরশীল করে ফেলবে অধ্যাপক হার্ড বলেন জিপিএসের দীর্ঘ ব্যবহার মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস ধূসর পদার্থের ঘনত্ব কমিয়ে দিবে মস্তিষ্কের এই অঞ্চলের ধূসর পদার্থের ঘনত্ব কমে যাওয়ার কারণে বিষন্নতা এবং অন্যান্য মনোরোগ বৃদ্ধি পায় যারা অনেকদিন ধরে জিপিএস ব্যবহার করছেন তাদের জায়গা চেনা ও মনে রাখার ক্ষমতা দুর্বল হয়ে পড়ে আপনি আপনার মনকে যত কম ব্যবহার করবেন আপনার মস্তিষ্কে জটিল জিনিস গুলো ধারণ করার সিস্টেম বা এপিসোডিক মেমোরি তত কম ব্যবহৃত হবে 

এর ফলে ডিমেনশিয়া বা স্মৃতিভ্রম হওয়ার সম্ভাবনা অনেক বেশি স্মার্টফোনগুলো স্পষ্টতই জ্ঞানের সম্পূর্ণ নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে কিন্তু এগুলো আমাদেরকে বর্তমান মুহূর্ত থেকে অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে যেমন আজকে হয়তো অনেক সুন্দর একটি দিন কিন্তু আপনি তা জানতেই পারলেন না কারণ আপনি হয়তো সারাদিন ফেসবুক স্ক্রল করে চলেছেন প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী এবং স্মৃতিশক্তি ওয়েন্ডি সুজুকি বলেছেন আমাদের জীবনের ঘটনা গুলো যদি আমরা মনে রাখতে না পারি তাহলে তা আমাদের মস্তিষ্ককে পরিবর্তন করে দেয় আমরা বিভিন্ন উৎসব অনুষ্ঠান বা কোথাও বেড়াতে গেলে স্মার্টফোনের ছবি তুলতে এত ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে নিজেদের চোখ আর মন দিয়ে সেই বিষয়গুলো অনুভব করি না পরবর্তীতে আমাদের ফোনে হয়তো সেই ছবিগুলো থেকে যায় কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কে সেই স্মৃতি থাকে না প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ লিন্ডা স্টোন এর মতে স্মার্টফোনের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের দূরদৃষ্টি অর্জনের ক্ষমতা কে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে নোবেল পুরস্কার বিজয়ী বায়োকেমিস্ট এবং নিউরো সাইন্টিস্ট এরিক্যান্ডেল এই তথ্যটি সমর্থন করেন তিনি গবেষণা করেছেন মনোযোগ হীনতা কিভাবে স্মৃতিশক্তি কে প্রভাবিত করে সাইকোলজিস্ট প্রফেসর বলেন স্মার্টফোনগুলো অবশ্যই আমাদের মনোযোগ কেড়ে নেয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছে 

বর্তমানে জনপ্রিয় বিভিন্ন অ্যাপ এমনভাবে নকশা করা হয়েছে যার মাধ্যমে আমাদের মনোযোগ কেড়ে নিয়ে তারা টাকা কামাতে পারে এর ফলে আমাদের অজান্তেই এসব অ্যাপ আমাদেরকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে হাউ টু ব্রেকআপ উইথ ইওর ফোন বইয়ের লেখকের বলেন আমাদের মস্তিষ্ক একসাথে একাধিক কাজ করতে পারে না যখন আমরা একসাথে একাধিক কোন কাজ করি তখন আসলে কাজ গুলোর মধ্যে একটি কাজে মনোযোগ থাকে না আপনি যদি আপনার ফোনে মনোযোগ দেন তবে আপনি অন্য কোন কিছুতে মনোযোগ দিতে পারবেন না এছাড়া অতিরিক্ত স্মার্টফোনের ব্যবহার আমাদের মস্তিষ্ককে অলস করে দেয় সেই সাথে সামাজিক এবং মানসিক দক্ষতা নষ্ট করে বর্তমানের ছেলে-বুড়ো সবাই আমরা রীতিমতো স্মার্টফোনের উপাসনা করছি বরং আমাদের এই প্রযুক্তির ব্যবহার উপাসনার চেয়েও অনেক বেশি কিছু যত সময় আমরা এই স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকি কোন ধার্মিক ব্যক্তি তার সৃষ্টিকর্তার উপাসনায় এত সময় ব্যয় করে না 

স্মার্ট ফোন আমাদের জীবনের এতটা প্রবেশ করেছে যে সেখান থেকে ফিরে আসার সহজ নয় আমাদের অনেকের অফিসের কাজ বা ব্যবসা-বাণিজ্য এখন স্মার্টফোনের কারণে অনেক সহজ হয়েছে জরুরি প্রয়োজনে যোগাযোগ খাবার অর্ডার করা গাড়ি ভাড়া করা থেকে শুরু করে ব্যাংকিং এমনকি আমাদের টাকা-পয়সাও থাকেন স্মার্টফোনে এমন পরিস্থিতিতে আমাদের স্মার্ট ফোন ছাড়া থাকাটাও মুশকিল স্মার্ট ফোনের ক্ষতিকর প্রভাব কিছুটা লাঘব করতে একটি কার্যকর পদ্ধতি হলো টেক ব্রেক বা প্রযুক্তি থেকে দূরে থাকা এই পদ্ধতিতে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এলার্ম সেট করে ফোন থেকে কিছুক্ষণের জন্য বিরতি নিতে পারেন এভাবে ফ্রোকাশ বা মনোযোগ বৃদ্ধি করা যায় এছাড়া নিয়মিত দিনের একটি নির্দিষ্ট সময়ে স্মার্ট ফোন পরিহার করে পরিবারের সদস্যদের সাথে সময় কাটানো উচিত।

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

নবীনতর পূর্বতন